স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে বাজেট বাড়ানোর পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

    38


    সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে স্বাস্থ্য বাজেটের আকার বাড়ানো প্রয়োজন। অনেক খাতে বরাদ্দ বাড়লেও ব্যয়ের সক্ষমতা ও দক্ষতা নেই। এ কারণে বাজেট অব্যবহৃত থেকে যায়। এসব বিষয় সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে।

    আজ বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কনফারেন্স রুমে বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম আয়োজিত ‘কেমন হলো স্বাস্থ্য বাজেট, ২০২২-২৩’ শীর্ষক গোলটেবিল অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

    জনস্বাস্থ্যবিদরা বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দক্ষিণ এশিয়ায় এখনো সবচেয়ে কম। যেটি ১০ শতাংশ হওয়া উচিত, তা এখনো ৬ শতাংশের নিচেই থাকছে। দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬৮ শতাংশই আসছে জনসাধারণের পকেট থেকে। এই ব্যয় ৫০ শতাংশে আনতে হলে অন্তত জাতীয় বাজেট ৭ থেকে ৮ শতাংশ বরাদ্দ থাকতেই হবে।’ 

    জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বিষয়ে অর্থনীতিবিদরা বলেন, বিদ্যমান বাস্তবতায় কিছুটা সঙ্কোচনমুখী বাজেট হলেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্যর মতো সামাজিক খাতের ওপর যেন এর বিরূপ প্রভাব না পড়ে। প্রায় এক দশক ধরেই স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ থাকে জাতীয় বাজেটের ৫ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে। আসন্ন অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ খুব বেশি বাড়েনি।

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, ‘কিছু প্রকল্প সম্প্রসারণ ছাড়া এবারের স্বাস্থ্য বাজেটে কোনো নতুনত্ব নেই। বরাদ্দের বৃদ্ধি মূলত ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতির ব্যবস্থা মেটাবে। কিন্তু করোনার মতো মহামারি মোকাবিলায় প্রস্তুতি ও সক্ষমতা বাড়াতে বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়নি।’

    হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের বিশ্লেষণে বলা হয়, দেশের নাগরিকেরা স্বাস্থ্যসেবা পেতে পকেট থেকে যে ৬৮ শতাংশ ব্যয় করেন, তার মধ্যে ওষুধ ও পচনশীল (এমএসআর) চিকিৎসাসামগ্রী কিনতে ব্যয় হয় ৬৭ শতাংশ। ৫ শতাংশ ব্যয় হয় ইমেজিং সেবা পেতে, ৭ শতাংশ ব্যয় হয় ল্যাবরেটরি সেবা পেতে, ইনপেশেন্ট কিউরেটিভ সেবা পেতে ব্যয় হয় ৮ শতাংশ এবং আউটপেশেন্ট কিউরেটিভ সেবা পেতে ব্যয় হয় ১৩ শতাংশ।

    স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) মহাসচিব অধ্যাপক এম এ আজিজ বলেন, ‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবারের বাজেট প্রস্তাবিত হয়েছে। বাজেটের মূল লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। আমরা দেখছি জনবলের সংকটের পাশাপাশি দক্ষতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। এটির জন্য একটা ইনস্টিটিউট দরকার, সেটি আজও পর্যন্ত হয়নি। দুর্নীতি, অনিয়ম ও দীর্ঘসূত্রতার ফলে জটিলতাগুলো বাড়ছে। মন্ত্রণালয় টেকনিক্যাল বিষয়গুলো নিয়ে কোনো ধরনের বিষয় বুঝতে যেমন চায় না, পরামর্শও নেয় না। একই সঙ্গে কেনাকাটার কোনো নীতিমালা নেই। আমরা বারবার বলে এসেছি সবকিছু ঢেলে সাজাতে হবে। আমাদের স্বাস্থ্যসেবার ৬৫ শতাংশই হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু এগুলো পর্যবেক্ষণে কোনো ব্যবস্থা নেই। এ ছাড়া অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি তো আছেই। এ জন্য স্বচ্ছতা বাড়াতে কোথায় অনিয়মগুলো হচ্ছে, সেটি আগে খুঁজে বের করতে হবে।’

    স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. শামিউল ইসলাম বলেন, ‘আমরা চাই যে বাজেট বরাদ্দ হয়, তার যথাযথ ব্যবহার। অধিক বরাদ্দ চাই। স্বাস্থ্যের উন্নয়ন করতে পারলেই সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব। সেবা পাওয়া মানুষের মৌলিক ব্যাপার। স্বাস্থ্যে ব্যয় বাড়লে জনগোষ্ঠীকে সুস্থ রাখতে পারব। বাজেটের বড় অংশই ব্যয় হয়ে থাকে অবকাঠামোতে।’

    বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস (বিএনএইচএ)-এর ১৯৯৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশের জিডিপির মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই বরাদ্দ মাথাপিছু পড়ে মাত্র ৪৫ ডলার। অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশ নেপাল, ভারত, ভুটান এবং শ্রীলঙ্কায় যথাক্রমে বরাদ্দ ৫৮, ৭৩, ১০৩ এবং ১৫৭ ডলার। অর্থাৎ প্রতিবেশী দেশের তুলনায় সবচেয়ে কম বরাদ্দ আমাদের।

    তাই জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে রোগীদের পকেট থেকে ব্যয় ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়। চিকিৎসা করাতে গিয়ে যেন রোগীরা দরিদ্র থেকে অতি দরিদ্র না হয়ে পড়েন। বাজেটে সেদিকে লক্ষ রাখার আহ্বান জানান স্বাস্থ্য খাতের সাংবাদিকেরা।

    গত অর্থবছরের তুলনায় স্বাস্থ্য বাজেট কম বেড়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘এবার গত বছরের মতো বা তার চেয়ে বেশি বাজেট হওয়া উচিত। করোনার কারণে অনেক কাজ গত বছর করতে পারিনি, এবার তা করতে চাই।’

    করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকায় এ খাত থেকে বরাদ্দ এবার কমেছে উল্লেখ করে জাহিদ মালেক বলেন, ‘করোনা প্রতিরোধে হেলথের ব্লক ফান্ড গত বছর ১০ হাজার কোটি টাকা ছিল। সেটা এবার কমে পাঁচ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। মোট হেলথ বাজেটের আকার ৪০ হাজার কোটি টাকা হবে। কারণ অন্যান্য মন্ত্রণালয়ও হেলথের কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।’

    অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির, টিকা কর্মসূচির পরিচালক ডা. শামসুল হক, অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলামসহ অনেকে।





    Source link