সচেতনতায় ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব

    35


    কয়েক বছর ধরে ডেঙ্গু জ্বরের নতুন একটি সমস্যা দেখা যাচ্ছে, তা হলো—লিভার আক্রান্ত হওয়া। এতে রোগী দুর্বল বোধ করে, খেতে পারে না, বমি হয়, লিভারে ব্যথা করে। এটি সাধারণত জ্বর কমে যাওয়ার পরপর দেখা দেয় এবং পাঁচ থেকে সাত দিন থাকতে পারে। এই রোগে কয়েক বছরে বেশ কিছু মানুষ মারা গেছে।

    ডেঙ্গু ভাইরাস হলো ফ্ল্যাভিভাইরিডি পরিবার ও ফ্ল্যাভিভাইরাসের অন্তর্ভুক্ত মশাবাহিত এক সূত্রক আরএনএ ভাইরাস। এটি ডেঙ্গু জ্বরের জন্য দায়ী। এই ভাইরাসের পাঁচটি সেরোটাইপ পাওয়া গেছে, যাদের প্রতিটিই পূর্ণরূপে রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম। এডিস ইজিপ্টি মশা এই ভাইরাসের বাহক। একই মশা ইয়েলো ফিভার ভাইরাস, জিকা ভাইরাস, চিকুনগুনিয়া ভাইরাসেরও বাহক।

    ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশা কোনো ব্যক্তিকে কামড়ালে সেই ব্যক্তি চার থেকে ছয় দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়। তারপর আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনো জীবাণুবিহীন এডিস মশা কামড়ালে সেই মশাটি ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়। এভাবে একজন থেকে অন্যজনে মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়িয়ে থাকে।

    ডেঙ্গু প্রধানত দুই ধরনের হয়:
    এক. ক্ল্যাসিক্যাল ডেঙ্গু ফিভার।
    দুই. হেমোরেজিক ফিভার।

    ডেঙ্গু জ্বর কখন ও কাদের বেশি হয়
    মে থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত, বিশেষ করে গরম ও বর্ষার সময় ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বেশি থাকে। তবে অপরিচ্ছন্নতা ও অব্যবস্থাপনার দরুন বর্তমানে কমবেশি সারা বছরই এর প্রকোপ দেখা যায়।
    ডেঙ্গুর ভাইরাস চার ধরনের হয়। তাই ডেঙ্গু জ্বরও চারবার হতে পারে। তবে যারা আগেও ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে পরে এ রোগ হওয়া মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি বেশি দেখা যায়।

    লক্ষণ
    ক্ল্যাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বর 

    • তীব্র জ্বর এবং শরীরে, বিশেষ করে হাড়, কোমর, পিঠসহ অস্থিসন্ধি ও মাংসপেশিতে তীব্র ব্যথা। জ্বর ১০৫ ফারেনহাইট পর্যন্ত হয়।
    • মাথাব্যথা ও চোখের পেছনে ব্যথা। 
    • জ্বর হওয়ার চার বা পাঁচ দিনের মাথায় পুরো শরীরে লালচে দানার মতো স্কিন র‍্যাশ ওঠা। 
    • বমি বমি ভাব ও বমি। 
    • অতিরিক্ত ক্লান্তিবোধ ও রুচি কমে যাওয়া। 
    • কখনো কখনো দুই বা তিন দিন পর আবার জ্বর আসা। 

    ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর 
    এ অবস্থা সবচেয়ে জটিল। এই জ্বরে ক্ল্যাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও উপসর্গের পাশাপাশি আরও বিভিন্ন উপসর্গ দেখা যায়।

    • শরীরে বিভিন্ন অংশ থেকে রক্ত পড়া। যেমন চামড়ার নিচে, নাক ও মুখ দিয়ে, মাড়ি ও দাঁত থেকে, কফের সঙ্গে, রক্ত বমি, পায়খানার সঙ্গে তাজা রক্ত বা কালো পায়খানা, চোখের ভেতর ও বাইরে রক্ত পড়তে পারে। নারীদের বেলায় অসময়ে ঋতুস্রাব হওয়া এবং অনেক দিন পর্যন্ত সেটা থেকে যাওয়া।
    • অনেক সময় বুকে ও পেটে পানি আসা।
    • লিভার আক্রান্ত হয়ে রোগীর জন্ডিস, কিডনি আক্রান্ত হয়ে রেনাল ফেইলিউরের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।

    ডেঙ্গু শক সিনড্রোম 
    এটি ডেঙ্গু জ্বরের ভয়াবহ রূপ। ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারের সঙ্গে সার্কুলেটরি ফেইলিউর হয়ে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হয়। 
    লক্ষণ

    • রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া।
    • নাড়ির স্পন্দন অত্যন্ত ক্ষীণ ও দ্রুত হওয়া।
    • শরীরের হাত-পা ও অন্যান্য অংশ ঠান্ডা হয়ে যাওয়া।
    • প্রস্রাব কমে যাওয়া।
    • হঠাৎ করে রোগীর জ্ঞান হারিয়ে ফেলা।

    কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন 
    ডেঙ্গু জ্বরের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। এই জ্বর সাধারণত নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়। তাই উপসর্গ অনুযায়ী সাধারণ চিকিৎসা যথেষ্ট। কিছু কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
    যেমন:

    • রক্তপাত হলে
    • প্লাটিলেটের মাত্রা কমে গেলে
    • শ্বাসকষ্ট হলে বা পেট ফুলে পানি এলে
    • প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে
    • জন্ডিস দেখা দিলে
    • অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা দেখা দিলে
    • প্রচণ্ড পেটে ব্যথা বা বমি হলে।

    যেসব পরীক্ষা করা দরকার

    • জ্বরের চার থেকে পাঁচ দিন পরে সিবিসি ও প্লাটিলেট পরীক্ষা। প্লাটিলেট কাউন্ট এক লাখের কম হলে ডেঙ্গু ভাইরাসের কথা বিবেচনায় রেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
    • পাঁচ থেকে ছয় দিন পর ডেঙ্গু অ্যান্টিবডি পরীক্ষা। 
    • প্রয়োজনে ব্লাড সুগার, লিভারের পরীক্ষা, যেমন এসজিপিটি, এসজিওটি, এলকালাইন ফসফাটেজ ইত্যাদি।
    • চিকিৎসক যদি মনে করেন রোগী ডিআইসি-জাতীয় জটিলতায় আক্রান্ত, সে ক্ষেত্রে প্রোথ্রোম্বিন টাইম, এপিটিটি, ডি-ডাইমার ইত্যাদি পরীক্ষা।
    • তবে সব পরীক্ষা না-ও লাগতে পারে। কোন পরীক্ষা দরকার, সে বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। 

    চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা 
    ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত বেশির ভাগ 
    রোগী সাধারণত ৫ থেকে ১০ দিনের মধ্যে নিজে নিজেই ভালো হয়ে 
    যায়। তবে রোগীকে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চলতে হবে, যাতে ডেঙ্গুজনিত কোনো মারাত্মক জটিলতা না হয়। 
    সাধারণত লক্ষণ বুঝে এর চিকিৎসা দেওয়া হয়।

    • সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত বিশ্রামে থাকতে হবে।
    • যথেষ্ট পরিমাণে পানি, শরবত, ডাবের পানি ও অন্যান্য তরলজাতীয় খাবার খেতে হবে।
    • খেতে না পারলে দরকার হলে শিরাপথে স্যালাইন দেওয়া যেতে পারে।
    • জ্বর কমানোর জন্য শুধু প্যারাসিটামল-জাতীয় ওষুধই যথেষ্ট। 
    • জ্বর কমানোর জন্য ভেজা কাপড় দিয়ে গা মোছাতে হবে।
    • জ্বর ও আনুষঙ্গিক সমস্যা তীব্রতর হলে কোনো ঝুঁকি না নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। 

    প্রতিরোধই সর্বোত্তম ব্যবস্থা
    ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধের মূল মন্ত্রই হলো এডিস মশার বিস্তার রোধ এবং এই মশা যেন কামড়াতে না পারে তার ব্যবস্থা করা। ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার ডিম পাড়ার উপযোগী জায়গা পরিষ্কার রাখতে হবে এবং একই সঙ্গে মশা নিধনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

    • বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড়, জঙ্গল, জলাশয় ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
    • যেখানে স্বচ্ছ পানি জমে থাকতে পারে, সেসব যেমন ফুলদানি, অব্যবহৃত কৌটা, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার ইত্যাদি সরিয়ে ফেলতে হবে।
    • ঘরের বাথরুমে বা কোথাও জমানো পানি পাঁচ দিনের বেশি না রাখা। 
    • এডিস মশা সাধারণত সকালে ও সন্ধ্যায় কামড়ায়। তাই দিনের বেলা শরীর ভালোভাবে কাপড়ে ঢেকে রাখতে হবে। প্রয়োজনে মসকুইটো রিপেলেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। 
    • বাড়িতে ও স্কুলে শিশুদের হাফ প্যান্ট বা শার্ট না পরিয়ে ফুল প্যান্ট বা শার্ট পরার ব্যবস্থা করুন। 
    • মশা নিধনের স্প্রে, কয়েল, ম্যাট ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে দিনে 
    • ও রাতে মশারি ব্যবহার করতে হবে। 
    • ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে অবশ্যই সব সময় মশারির মধ্যে রাখতে হবে, যাতে কোনো মশা পুনরায় কামড়াতে না পারে।

    এডিস মশা এ দেশে আগেও ছিল, এখনো আছে; প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির পরিবেশও আছে। তাই সচেতনতা ও প্রতিরোধের মাধ্যমেই এর হাত থেকে বাঁচা সম্ভব। 

    লেখক: চক্ষুরোগ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, সাবেক ফ্যাকাল্টি মেম্বার ও প্রশিক্ষক, চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র 





    Source link