বন্য়ায় শিশুর সুরক্ষায়

    7


    প্রাকৃতিক দুর্যোগের কাছে সব সময়ই আমরা পরাজিত হয়ে যাই কোনো না কোনোভাবে। চরম ভোগান্তি আর সংকটের মধ্যে জীবন পার করতে হয় সমাজের একটি অংশকে। এ সময় আমাদের কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, বিশেষ করে শিশুদের ব্যাপারে। শিশুরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় যেকোনো দুর্যোগ পরিস্থিতি এবং দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে। চলমান বন্যায় একদিকে খাদ্য ও পানীয়ের সংকটের মধ্যে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে যেতে হচ্ছে লাখো মানুষকে, অন্যদিকে যুদ্ধ করতে হচ্ছে পানিবাহিত রোগ, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ এবং চর্মরোগের মতো অসুখের সঙ্গে। 

    শিশুদের প্রতি খেয়াল রাখুন

    • পানি ও কাদার সংস্পর্শে হাত-পায়ের চামড়ায় চুলকানি এবং ছত্রাকের আক্রমণ দেখা দেয়। এ থেকে রক্ষা পেতে বন্যার পানিতে ভিজে গেলে শিশুকে যত দ্রুত সম্ভব পরিষ্কার পানি দিয়ে গোসল করিয়ে দিতে হবে।
    • শিশু যেন বেশি সময় ভেজা অবস্থায় না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। দ্রুত ভেজা কাপড় বদলে শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে দিতে হবে। নবজাতক থেকে একটু বড় শিশুদের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
    • অতি কৌতূহলের কারণে এ সময় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর হার অনেক বেশি। তাই সব সময় তাদের নজরে রাখতে হবে।
    • এ সময় বিভিন্ন কারণে বিদ্যুতায়িত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। শিশুরা যেন এগুলোর সংস্পর্শে না আসে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
    • আশ্রয়কেন্দ্রে থাকাকালে কষ্ট হলেও শিশুদের প্রতি নজর রাখতে হবে আলাদা করে।
    • ব্যবহারের জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা যেতে পারে। যদি সম্ভব না হয় তবে বন্যার পানি পরিষ্কার পাত্রে সংগ্রহ করে প্রথমে কিছুক্ষণের জন্য রেখে দিন। তলানি পড়লে ওপরের পরিষ্কার পানি আলাদা পাত্রে ঢেলে নিয়ে ফুটিয়ে নিন। তবে জ্বালানির সংকট থাকলে বা ফোটানো সম্ভব না হলে ক্লোরিনের মাধ্যমে পানি বিশুদ্ধ করা যায়।
    • শুকনো খাবার এবং শিশুদের খাবারে ছত্রাকের সংক্রমণ হয়েছে কি না, সেটা বারবার খেয়াল করতে হবে।
    • বন্যার সময় সাপ, ইঁদুর, পোকামাকড় প্রায়ই ঘরে ঢুকে আসবাবের নিচে বা অন্ধকার জায়গায় ঘাপটি মেরে থাকে। শিশুরা যেন সেসব জায়গায় না যায়, সেদিকে নজর দিতে হবে। 
    • পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার স্যালাইন, জ্বরের ওষুধ হাতের কাছে রাখতে হবে। ঘরে না থাকলে পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলো সংগ্রহ করার চেষ্টা করুন। সম্ভব হলে অ্যাজমায় আক্রান্ত শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং নেবুলাইজেশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
    • ডায়রিয়ার সময় পানিশূন্যতা প্রতিরোধ করা জীবন রক্ষাকারী একটি পদক্ষেপ। তাই সঠিক নিয়মে খাবার স্যালাইন বানিয়ে শিশুকে দিতে হবে। ৫০০ মিলিলিটার পানিতে এক প্যাকেট স্যালাইন গোলাতে হবে; শিশুরা ছোট বলে পানি কম দেওয়া যাবে না।
    • জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল সিরাপ প্রতি ১০ কেজি ওজনের শিশুর জন্য এক চামচ; ১৫ কেজির শিশুর জন্য দেড় চামচ এবং ২০ কেজির শিশুর জন্য দুই চামচ খাওয়ানো যাবে। জ্বর থাকলে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা পর পর শিশুকে এভাবে প্যারাসিটামল সিরাপ খাওয়াতে হবে।
    • আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা বাড়িতে এই সময় অনেক মানুষকে একসঙ্গে থাকতে হয়। সুতরাং খাবার এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি শিশুরা যেন যৌন হয়রানির শিকার না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখা আবশ্যক। 

    বন্যা-পরবর্তী সময়ে করণীয়

    • বন্যা-পরবর্তী সময়ে শিশুদের জ্বর-সর্দি, ডায়রিয়া, কলেরা, রক্ত আমাশয়, টাইফয়েড, প্যারাটাইফয়েড, ভাইরাল হেপাটাইটিস, পেটের অসুখ, কৃমির সংক্রমণ, চর্মরোগ, চোখের অসুখ প্রভৃতির প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়। তাই নিরাপদ পানি ছাড়া অন্য পানি দিয়ে গোসল, থালাবাসন ও কাপড় ধোয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। বারবার শিশুর হাত ধুয়ে দিতে হবে। 
    • বন্যা-পরবর্তী সময়ে আসবাব, জামাকাপড়, বিছানা-বালিশ এবং শিশুদের খেলনায় ছত্রাকের সংক্রমণ হয়েছে কি না খেয়াল করতে হবে। ভেজা বা ছত্রাকের সংক্রমণ হয়েছে, এমন খেলনা শিশুদের দেওয়া যাবে না। খাবারের বেলায়ও এটা প্রযোজ্য।
    • দুই বছরের বেশি বয়সী শিশুদের কৃমিনাশক ওষুধ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। দুই বছরের নিচের শিশুর কৃমির সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কৃমিনাশক দিতে হবে।
    • বন্যার কারণে যেসব শিশু ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খেতে পারেনি, তাদের জন্য নিকটস্থ টিকাদান কেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে।
    • যেসব শিশু নিয়মিত টিকা থেকে বাদ পড়ে গেছে, কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেগুলো দিয়ে নিতে হবে।
    • স্কুলে পাঠানোর আগে সড়ক মেরামত হয়েছে কি না, স্কুলঘর পরিষ্কার এবং নিরাপদ হয়েছে কি না, এ ব্যাপারগুলো খেয়াল করতে হবে।
    • বাসাবাড়ির মেরামতে শিশুদের কাজে লাগানো থেকে বিরত রাখতে হবে।
    • বিদ্যুতের তার, সকেট এগুলো থেকে শিশুদের দূরে রাখতে হবে। 

    লেখক: স্পেশালিস্ট, পেডিয়াট্রিক আইসিইউ, এভারকেয়ার হাসপাতাল, ঢাকা





    Source link