যেসব ছবির উপজীব্য রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড

34


গুলিবিদ্ধ জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা গেছেন। এই খবর এখন পৌঁছে গেছে বিশ্বের আনাচে–কানাচে। শুক্রবার জাপানের নারা শহরে বক্তব্য দেওয়ার সময় পেছন থেকে গুলি করা হয় ৬৭ বছর বয়সি শিনজো আবেকে। তিনি তখন একটি রেলস্টেশনের বাইরে বক্তব্য দিচ্ছিলেন। এ ঘটনায় পুলিশ এক ব্যক্তিকে আটকও করেছে।

দেশের ক্ষমতাসীন বা একদা ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের হত্যার ঘটনা এমন আরও আছে। সেসব হত্যাকাণ্ড নিয়ে একাধিক চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। আসুন, এমনই কিছু আলোচিত সিনেমা সম্পর্কে একটু জেনে নেওয়া যাক—

মাদ্রাজ ক্যাফে (২০১৩)
পরিচালক: সুজিত সরকার
অভিনয়: জন আব্রাহাম, নারগিস ফাখরি, সিদ্ধার্থ বসু, প্রকাশ বেলাওয়াদি

‘মাদ্রাজ ক্যাফে’ সিনেমায় জন আব্রাহাম। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ১৯৯১ সালের ২১ মে এক আত্মঘাতী বোমার বিস্ফোরণে নিহত হন। চেন্নাই (তদনীন্তন মাদ্রাজ) শহর থেকে ৩০ মাইল দূরে শ্রীপেরামবুদুর শহরে রাজীব গান্ধীর শেষ জনসভাটির আয়োজন করা হয়েছিল। এই জনসভায় তিনি তামিলনাড়ুর শ্রীপেরামবুদুর লোকসভা কেন্দ্রের কংগ্রেস প্রার্থী শ্রীমতী মারাগতাম চন্দ্রশেখরের সমর্থনে নির্বাচনী প্রচারে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেখানেই আত্মঘাতী বোমার হামলায় নিহত হন রাজীব।

এই হত্যাকাণ্ডের ২৩ বছর পর বলিউডের ‘মাদ্রাজ ক্যাফে’ সিনেমাতে উঠে আসে অন্তরালের নানা কাহিনী। ভারতের একজন প্রধানমন্ত্রীকে আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে মেরে ফেলার মতো এত বিধ্বংসী পরিকল্পনা ঠিক কীভাবে সম্পন্ন হয়েছিল, তা এই ছবিতে উঠে আসে কিছুটা। এই পরিকল্পনার নেপথ্যে ছিল গত শতকের নব্বইয়ের দশকে দাপুটে শ্রীলংকান বিদ্রোহী গোষ্ঠী এলটিটিই (লিবারেশন টাইগার্স অফ তামিল এলম) বা তামিল টাইগার্স। লন্ডনের মাদ্রাজ ক্যাফেতে কিছু ব্যবসায়ী হাত মেলায় তামিল টাইগারের সাথে এবং অস্ত্র দিতে থাকে তামিলদের। ভারতীয় সেনাবাহিনী ওই সময় লাগাতার আক্রমণ চালাচ্ছিল তামিল টাইগারদের বিরুদ্ধে। তার প্রতিশোধ হিসেবে নেওয়া হয় শ্রীলংকার জাফনা থেকে ভারতে সুইসাইড স্কোয়াড পাঠানোর পরিকল্পনা।

‘মাদ্রাজ ক্যাফে’ সিনেমায় নারগিস ফাখরি। ছবি: সংগৃহীত একজন গুপ্তচরের ব্যক্তিগত জীবনকে অবলম্বন করে এগিয়ে চলে ‘মাদ্রাজ ক্যাফে’ ছবির কাহিনী। এই গুপ্তচরের চরিত্রে অভিনয় করেছেন জন আব্রাহাম। সিনেমাটি জন আব্রাহামের ক্যারিয়ারের সেরা কাজ। সাংবাদিক চরিত্রে আছেন নারগিস ফাখরি।  সিনেমাটোগ্রাফি, ন্যারেটিভ স্টোরি টেলিং, ভিজুয়াল, এ্যাওয়ার্ড উইনিং অডিওগ্রাফী, চোখের পলক ফেলার সুযোগ নেই। সিনেমায় অনেকগুলো চরিত্র থাকলেও প্রত্যেকে সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। প্রত্যেকেই সূক্ষ্ম অভিনয়দক্ষতা দেখিয়েছেন। বলিউডের নাচ-গান-প্রেম এসব থেকে ভিন্ন এই সিনেমা। কাহিনীর সেন্সিটিভিটির কারণে অনেকেই এই সিনেমা প্রযোজনা করতে রাজি হননি, পরে জন আব্রাহাম নিজেই সিনেমাটি প্রযোজনার সিদ্ধান্ত নেন। সুজিত সরকার পরিচালনায় মুন্সিয়ানার ছাপ দেখিয়েছেন। যুদ্ধের ভয়াবহতার দৃশ্যগুলো ক‍্যামেরার লেন্সের পর্দায় বেশ ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কালার গ্রেডিং এবং অ্যাকশন দৃশ্যগুলো বেশ বাস্তবসম্মত ছিলো। ১৩০ মিনিটের এই সিনেমায় একঘেয়েমিতা আসার কোনো সুযোগ নেই। যত সময় এগিয়ে যাবে টানটান উত্তেজনা অনুভব করবেন। সিনেমাটি দেখলে নতুন করে জানার আগ্রহ হবে রাজীব গান্ধি হত্যার কৌশল, তামিল টাইগারদের লড়াই, ভারতের জড়িয়ে যাওয়া এই যুদ্ধ এবং যুদ্ধ ছেড়ে চলে আসার কারন, ইন্টেলিজেন্স দের কোড/ডিকোড আর স্পাইদের খবর সংগ্রহের কৌশল, তামিল টাইগার প্রভাকরণের নেতৃত্বগুণ।

জেএফকে (১৯৯১)
পরিচালক: অলিভার স্টোন
অভিনয়: কেভিন কস্টনার, কেভিন বেকন

জেএফকে সিনেমায় কেভিন কস্টনার। ছবি: সংগৃহীত ড্রামা, থ্রিলার কিংবা ইতিহাস- তিন জনরা নিয়েই এই সিনেমা। আমেরিকার ইতিহাসের ৩৫তম প্রেসিডেন্ট ছিলেন জন এফ কেনেডি। ধনী পরিবারে বড় হওয়া হার্ভার্ড গ্রাজুয়েট কেনেডি হয়ে ওঠেন একজন সেলিব্রিটি। ১৯৬০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রথমবারের মত টিভিতে প্রচারিত হয় প্রেসিডেন্সিয়াল প্রার্থীদের ডিবেট। সেই নির্বাচনেই সাবেক ভাইস-প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে হারিয়ে তিনি প্রেসিডেন্ট হন। নানা কারণে তিনি বেশ আলোচিত ছিলেন। প্রেসিডেন্ট কেনেডি খুব বেশি দিন কিন্তু প্রেসিডেন্ট ছিলেন না। প্রেসিডেন্সির ৩ বছর পূর্তির আগেই তাকে হত্যা করা হয়। তাঁর ছোট ভাই ববিও একই পরিণতির শিকার হন ১৯৬৮ সালের প্রেসিডেন্সিয়াল ডেমোক্রেটিক প্রার্থী নির্বাচনের ক্যাম্পেইনে।

‘কেনেডি কার্স’ বলে একটা কথা প্রচলিত ছিল সেসময়। কারণ ওই পরিবারের অনেকেই অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরন করেছেন। কেনেডির হত্যা নিয়ে রয়েছে বেশ ধোঁয়াশা এবং তদন্তেও ছিল অনেক অসচ্ছ্বতা। আর সেই রহস্যই উদ্ঘাটনে নামেন নিউ অরলিন্সের ডিস্ট্রিক অ্যাটর্নি জিম গ্যারিসন।

প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি হত্যকাণ্ডের আগ মুহুর্ত। ছবি: সংগৃহীত ‘জেএফকে’ ছবিটির প্লট শুরু হয় ১৯৬৬ সালের প্রেক্ষাপটে। তখন লুইজিয়ানা রাজ্যের নিউ অরলিনসের অ্যাটর্নি জিম গ্যরিসন এই হত্যার পেছনে সরকারি, সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীর জড়িত থাকার বেশ কিছু তথ্য পেতে শুরু করেছিলেন। জিম টিভিতে লাইভ এই হত্যাকাণ্ড দেখছিলেন। একটা সময় এই হত্যাকাণ্ডের রায়ের আর কোন অগ্রগতিই হয় না কারণ যে হত্যাকারি তাকেই মেরে ফেলা হয়েছে। তিন বছর পরের কথা। আমেরিকা আক্রমণ করেছে ভিয়েতনামকে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ তুঙ্গে। জিম আবারো কেনেডির হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিস্তারিত পড়ালেখা করতে থাকে। হত্যাকারী অসওয়াল্ড এর স্বীকারোক্তির ডকুমেন্ট খুঁজে পাচ্ছিলো না কারণ তাঁর কোন রেকর্ডই নেই। এরপর আরো জানতে গিয়ে সে আবিষ্কার করলো কেনেডি হত্যাকাণ্ড নিয়ে আমেরিকার জনগণকে অন্ধকারেই রেখেছে সরকার। সে আবারো সেই কেসকে নিয়ে উঠে পড়ে। সিনেমায় সেই গল্পটিই অসাধারণভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

কিভাবে হত্যকাণ্ড ঘটিয়েছেন বর্ণনা দিচ্ছে কিম গিউ পায়োং। ছবি: সংগৃহীত সেরা অভিনেতাদের নাম জিজ্ঞেস করলে কেউ হয়ত কেভিন কস্টনারের নাম উল্লেখ করবেন না। কিন্তু এই সিনেমায় তিনি ইতিহাস সৃষ্টিকারী অভিনয়শৈলী দেখিয়েছেন। পরিচালক অলিভার স্টোনের মাস্টারপিস বলা হয় এই সিনেমাকে। তিনবার অস্কার বিজয়ী পরিচালক অলিভার স্টোন। মুক্তির আগে ১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সকল শীর্ষস্থানীয় কংগ্রেস সদস্যদের দেখানো হয়। মুক্তির পর ঝড় তুলে। ২ অস্কার ঘরে তুলে নেয় এই সিনেমা। আর পরিচালক অলিভার যখন জিমের বই পড়ে (সেই এটর্নি জেনারেলের এই কেনেডি হত্যাকাণ্ড নিয়ে লেখা বই), সাথে সাথেই সিনেমা বানানোর রাইট কিনে নেয় নিজের টাকায়! যথারীতি পরিচালনায় কারিশমা দেখিয়েছেন এই লিজেন্ডারি পরিচালক। আর জিমের ভুমিকায় কেভিন কস্টনার অসাধারণ অভিনয় করেছেন। 

সাধারনত ইতিহাস নিয়ে তৈরি চলচ্চিত্র কিছুটা ধীরগতির হয়। এই পলিটিক্যাল থ্রিলারটি সেক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। একই সঙ্গে ইতিহাস জানার এবং থ্রিলার দেখার এক অনন্য অভিজ্ঞতা হবে ‘জেএফকে’–তে।

দ্য ম্যান স্ট্যান্ডিং নেক্সট (২০২০)
পরিচালনা: উ মিন-হো
অভিনয়: লি বাইং-হুন, লি সুং-মিন, কোয়াক ডো-জয়, লি হি-জুন

দ্য ম্যান স্ট্যান্ডিং নেক্সট সিনেমার কলাকুশলীরা। ছবি: সংগৃহীত দক্ষিণ কোরিয়ার স্বৈরশাসক ছিলেন পার্ক চং হে। দেশটিতে টানা ১৮ বছর ধরে একনায়ক থাকা প্রেসিডেন্ট পার্ক খুন হন ১৯৭৯ সালে। আর খুনটা করেছিলেন কোরিয়ান সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (কেসিআইএ) পরিচালক কিম গিউ পায়োং। অথচ কোরীয় বিপ্লবে দুজনে একসাথে লড়েছিলেন!

১৯৭০ সালের ২৬ অক্টোবর রাতে কেসিআইএ প্রধান ও তার দুই সহযোগী মিলে প্রেসিডেন্ট পার্ককে খুন করার ৪০ দিন আগে কি কি ঘটেছিল তা তুলে ধরা হয়েছে ‘দ্য ম্যান স্টান্ডিং নেক্সট’ নামক ছবিতে। দু বছর আগে দক্ষিণ কোরিয়ার বক্স অফিস কাঁপিয়েছিল সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমা। 

কোরিয়ান সিনেমায় মারামারি, গোলাগুলি দেখে যারা অভ্যস্থ, তারা নতুন স্বাদ পাবেন এই ছবিটিতে। কেন ওই ঘটনা ঘটেছিল? ঘটনার পেছনে ব্যক্তি স্বার্থ ছিল নাকি দেশের স্বার্থ? এ ধরনের প্রশ্নগুলোর উত্তর সম্পর্কে কিছুটা হলে ধারণা মেলে এই ছবিটিতে। 

‘দ্য ম্যান স্ট্যান্ডিং নেক্সট’ সিনেমায় লি বাইং-হুন। ছবি: সংগৃহীত এ চলচ্চিত্রে অভিনয়ে ছিলেন কোরিয়ার বাঘা বাঘা অভিনেতারা। কেসিআইএ প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন লি বয়ং হুন। লিয়ের বয়স ৫০ কেউ বলবেনা, অভিনয় কিংবা ফিটনেসে বুঝার উপায় নেই। লি সাং মিন করেছেন প্রেসিডেন্টের চরিত্র। সিনেমার শুরুটা এভাবে, কেসিআইএ এর সাবেক ডিরেক্টর আমেরিকায় নিজের জীবনের উপর একটি বই লিখেন যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে পার্ক ১৮ বছর ধরে তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে যাচ্ছেন। আর এদিকে প্রেসিডেন্ট পার্কের সাথে কাজ করা কিমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আমেরিকা গিয়ে আত্নজীবনীটি ফিরিয়ে আনার জন্য। বইয়ের লেখক আর কিম দুইজনই কোরিয়ার বিপ্লবের জন্য একসাথে লড়েছিলো। এখন প্রশ্ন হচ্ছে রাজনৈতিক এই বেড়াজালে কে কার সাথে থাকবে কে কাকে ধোকা দিবে, কার পরিণতি কি হবে,  স্বৈরশাসকের আদো পতন হবে নাকি। তা এই সিনেমায় ফুটে উঠেছে।

সিনেমার সবচেয়ে ভালো দিক এর অসাধারন বিজিএম। যেটা সবসময় বুঝাচ্ছিলো চরিত্রগুলোর মধ্যে কি যেন এক ক্ষুধা। সামনে কি যেন ঘটতে যাচ্ছে। সাথে আছে কালার গ্রেডিংয়ের অসাধারণ সমন্বয়। সিনেমাটোগ্রাফি দেখে মনে হবে আপনি ১৯৮০ সালে বসে সিনেমাটি দেখছেন। একটা দৃশ্যে লি বয়ং হুন স্টেইজের দিকে তাকিয়ে ছিল। স্টেজের লাইটগুলো আস্তে আস্তে নিভিয়ে দেয়া হচ্ছিল। সে যখন স্টেজে বসেছিল, তার নির্দেশে নিজের বন্ধুকে হত্যা করছিল স্পাইরা। সে আর ভাল মানুষ নেই। অন্ধকার দিয়ে বুঝিয়ে দেয়া হল। এরপর দুজন ব্যক্তির জুতা নেই দেখানো হয়েছে। অসহায়ত্ব ফুটিয়ে তোলার জন্য এই ব্যাপার টা দেখানো হয়েছে।





Source link