রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ে ধাক্কা, চিন্তায় রিজার্ভ

18


ডলার আয়ের প্রধান দুটি ভরসার জায়গা রপ্তানি আয় আর রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ে ধাক্কা লাগতে শুরু করেছে। একে একে দুটি উৎস থেকে ডলার আসা কমে গেছে। এদিকে ডলারের বাজারে নৈরাজ্য ঠেকাতে চার দিন আগে এর দাম নির্দিষ্ট করে দেওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে ডলারের বিপরীতে টাকার মান আরও ৯০ পয়সা কমিয়ে ডলারকে আরও শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। এর ফলে এখন প্রতি ডলারের বিনিময়মূল্য দাঁড়িয়েছে ৮৯ টাকা ৯০ পয়সা।

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিদেশ থেকে ডলার বা অন্য বৈদেশিক মুদ্রা বেশি এলে সরকার নির্ভার থাকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যত বেশি ডলার আসে, রিজার্ভ তত বাড়ে। এ রিজার্ভের ডলার খরচ করে সরকার বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির দায় শোধ করে। কয়েক মাস ধরে দায় শোধে বেশি খরচ হওয়ায় ডলারের মজুতে টান পড়েছে। গত কয়েক মাসে আগের রেকর্ড ৪৮ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ এসে ঠেকেছে ৪২ বিলিয়ন ডলারের ঘরে। এ থেকে বেশি উঁচুতে আর উঠতে পারছে না।

এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় ডলার খরচ কমাতে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্যে আছে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা, বিলাসী পণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণ, ১৩৫ পণ্যে বাড়তি নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ।  

এর মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার আয়ের বড় দুই খাত রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে ধাক্কা লেগেছে। গত বুধবার জানা যায়, মে মাসে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আগের বছরের একই মাসের চেয়ে ১৩ শতাংশ কমেছে। ওই মাসে প্রবাসীরা মোট ১৮৮ কোটি ৫৩ লাখ ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। ২০২১ সালে যা ছিল ২১৭ কোটি ১০ লাখ ডলার।

রপ্তানি আয়ও কমেছে মে মাসে। সরকারি তথ্য বলছে, মে মাসে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে ৩৮৩ কোটি বা ৩ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ। এই আয় গত ৯ মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কম। আগের মাসে এপ্রিলের চেয়ে আয় ১৯ দশমিক ১৭ শতাংশ কম হয়েছে।  

এরই মধ্যে গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের নির্দিষ্ট দাম থেকে বের হয়ে এসে ব্যাংকগুলোকে নিজেদের মতো করে কেনাবেচা করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।

পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে টাকার মান ৯০ পয়সা কমানো হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীদের অর্থ পাঠানো উৎসাহিত করাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল লক্ষ্য।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘গত রোববার ডলারের দাম নির্ধারণ করে দেওয়ায় প্রবাসী আয় সংগ্রহ কমেছে বলে অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। এতে দেশে রিজার্ভের সংকট বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছিল। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের রেমিট্যান্স নিয়ে হালনাগাদ প্রতিবেদনে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। তাই রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে ডলারের দাম বেঁধে দেওয়ার মাত্র তিন দিনের মাথায় সিদ্ধান্ত থেকে আমরা সরে এসেছি। আর ডলারের সীমা তুলে দেওয়ার বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আর এফ হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া রেটে রেমিট্যান্স সংগ্রহ ও আন্তব্যাংক লেনদেন প্রায় অচল হয়ে পড়ে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আমদানি-রপ্তানি বাজারে। আর রিজার্ভে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের দামের সীমা তুলে দিয়েছে। এখন মুক্তবাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মে ডলারের দাম নির্ধারণ করে লেনদেন চলবে।’ 
নিট পোশাক খাতের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ডলারের দর এভাবে ব্যাংকের খেয়ালখুশির ওপর ছেড়ে না দিয়ে বরং ডলার যত দাম দিয়ে তারা কেনে, তার সঙ্গে আরও ৫০ পয়সা মুনাফা ধরে ঠিক করে দেওয়া দরকার ছিল। না হলে, ব্যাংকাররা তাদের ইচ্ছেমতো লাভ করেই যাবে। তিনি মনে করেন, নতুন নির্দেশনায় রেমিট্যান্সের জন্য কিছুটা সহায়ক হলেও রপ্তানির ক্ষেত্রে খুব লাভ হবে না। তিনি বলেন, এখন রপ্তানি আয় যেটুকু কমেছে, এটাই স্বাভাবিক। কারণ এত দিন অস্বাভাবিক অর্ডার ছিল। এখন বাজার সংশোধন হয়ে স্বাভাবিক জায়গায় যাচ্ছে। একে শিগগির অনেক ওপরে নিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

ডলারের দরের সীমা তুলে দেওয়ার বিষয়ে বিজিএমইএর সহসভাপতি শহীদুল্লা আজিম বলেন, ‘ডলারের একটি নির্দিষ্ট দর থাকা উচিত। এ দর সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেঁধে দিতে পারে। তা না হলে বাজার সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ যে যার মতো করে ডলারের রেট দেবে। ব্যাংক কম রেট দিলে তো রেমিট্যান্স সংগ্রহ কমে যাবে। আবার বেশি রেট দিলে ব্যাংকের মুনাফা কমে যাবে। সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলো লাভবান হতে সব চেষ্টা করবে। এতে প্রবাসী ও ব্যবসায়ীদের তুলনায় ব্যাংকের লাভ বেশি হবে।’

মানি চেঞ্জার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ কে এম ইসমাইল হক বলেন, ‘ডলারের দাম নির্ধারণ করার সঙ্গে খোলাবাজারের দামে তেমন একটা প্রভাব পড়ে না। কারণ আমরা ব্যাংক থেকে ডলার কেনাবেচা করি না। আমরা অল্প পরিমাণ সংগ্রহ ও বিক্রি করি। আমরা সাধারণত ৫০ পয়সার মতো লাভে ডলার বিক্রি করি।’





Source link