সেতু হলো, রাস্তা হলো তবু দুর্ভোগ গেল না

38


পদ্মার ওপর সেতু হয়েছে, দক্ষিণের মানুষের আর চিন্তা কিসের? যমুনায় সেতুর পরও ভোগাচ্ছিল সরু রাস্তা। সেটাও এখন চওড়া হয়েছে, উত্তরের মানুষ আর ভুগবে কেন? ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক তো অনেক আগে থেকেও প্রশস্ত। তবু সেখানে আটকে যাচ্ছে যান।

সেতু হওয়ায় এবং রাস্তার অবস্থা মোটামুটি ভালো থাকায় অনেকেই আশা করেছিলেন এবারের ঈদযাত্রায় শুধু স্বপ্নই বাড়ি যাবে, ভোগান্তি আর সঙ্গী হবে না। কিন্তু তা আর হলো না। ঈদের আগের দুই দিন হুট করে যেন থমকে গিয়েছিল বড় বড় মহাসড়ক। পথের ক্লান্তি নিয়ে ঈদের আগে বাড়ি ফিরেছে মানুষ। এখন তারা দুশ্চিন্তায় পড়েছে ফিরতি যাত্রা নিয়ে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাস্তাঘাট ভালো থাকলেও এবারের ভোগান্তি অব্যবস্থাপনার কারণে। প্রথমত, ঈদের আগে ছুটি কম ছিল। বৃহস্পতিবার অফিস করে পথে বেরিয়েছে মানুষ। শুক্র ও শনিবার সেই চাপ। হুট করে মহাসড়কে বন্ধ করে দেওয়া হলো মোটরসাইকেল। আগের ঈদেও ঘরমুখী মানুষের একটি বড় অংশ ফিরেছিল মোটরসাইকেলে। এবার সেটা সম্ভব হয়নি, তবে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশায় ছিলেন অনেকে। সরকার হয়তো নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। সে জন্য এই মানুষগুলো আগেভাগে বাস-ট্রেনের টিকিট কেটে রাখেননি। ফলে পরিবহন না পেয়ে ঢাকা শহরের ছোট বাস ভাড়া করে গন্তব্যে গেছে মানুষ। তাতে লক্কড়ঝক্কড় বাস যেখানে-সেখানে নষ্ট হয়েছে, যানজট তৈরি হয়েছে সড়কে। অনেক জায়গায় রাস্তার ওপর ছিল হাট। টোল প্লাজায় ধীরগতি। সব মিলিয়ে রাস্তা ঠিক থাকলেও ব্যবস্থাপনার অদক্ষতার কারণে ভুগেছে মানুষ।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও বিষয়টি একার্থে স্বীকার করেছেন। গতকাল তিনি সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, যানজট যেখানে হয়েছে সেটা ব্যবস্থাপনার কিছু ত্রুটির কারণে। সমন্বয়ের অভাব। হাইওয়ে পুলিশ, জেলা প্রশাসন সব পক্ষেরই দায় রয়েছে এবারের যানজটের পেছেন। 
তবে সেটা আবার মানতে চান না পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী। তিনি গতকাল আজকের পত্রিকাকে বলেন, সড়কের ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের ঘাটতি ছিল না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সেতুতে এক দিনে ৪৩টা গাড়ি নষ্ট হয়েছে। সেটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ঈদের সময় খারাপ গাড়ি সড়কে চলতে গিয়ে নষ্ট হয় এবং যানজট তৈরি হয়।

উত্তরের পথে ভোগান্তি বেশি
প্রতি ঈদে জট লাগে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে। কয়েক বছর ধরে এই রাস্তাটিতে কাজ করা হচ্ছে। দুই লেনের সড়ক এখন চার লেন হয়েছে। এত দিন রাস্তার কাজের কারণে জট লাগলেও এবার সেটি হবে না বলে আশা করেছিল এ পথের মানুষ। কিন্তু সেই আশা সত্যি হলো না। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানজট শুরু হয় গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে। সেই জট চলতে থাকে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত। একই অবস্থা ছিল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কেও। এ পথে টোল প্লাজায় ধীরগতির কারণে ছিল যানজট। ঢাকা থেকে বের হওয়ার পথেও ছিল জট। যাত্রাপথের দুর্ভোগ ভোগান্তি সইতে না পেরে অনেক যাত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের দুর্ভোগ নিয়ে একজন লিখেছেন, ‘গত ৮ জুলাই রাত ১০টায় গাবতলী থেকে বাসে উঠেছিলাম। ভেবেছিলাম পরদিন সকাল ১০টা নাগাদ বাড়িতে পৌঁছাব। কিন্তু বাসেই ৩৫ ঘণ্টা বসে থাকতে হয়েছে। এবারের অভিজ্ঞতা খুবই তিক্ত। কবে এই দুর্ভোগের অবসান হবে?’ এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে আজকের পত্রিকাকে বলেন, ৭ জুলাই চন্দ্রাতেই প্রথম যানজট শুরু হয়। সেই জট নবীনগর সাভার পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। ঢাকার সব বাস এসে চন্দ্রার মোড়ে যাত্রী তোলে, যার কারণে সেখানে জট লাগে। 

শ্যামলী এন আর ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শুভঙ্কর ঘোষ রাকেশ বলেন, যানজটের কারণে ঢাকা থেকে বাস সময়মতো ছাড়তে পারেনি। এবারও মহাসড়কে ছোট গাড়ি চলেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাও কম ছিল। ফলে মহাসড়কের অবস্থা খারাপ ছিল এবার। 
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, বিকল্প চিন্তা না করে হুট করে ঈদে মোটরসাইকেল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত ঠিক হয়নি। এর ফলে সড়কে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।

সার্বিক বিষয়ে বুয়েটের অধ্যাপক ড. শামসুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, যানজটের হটস্পট মোড়, হাটবাজার, টোল প্লাজা, ধীরগতির যানবাহন এসব নিয়ে সারা বছর কাজ করতে হবে। শুধু ঈদের সময় করলে সুফল আসবে না। বৈজ্ঞানিকভাবে সড়ক নির্মাণ না করে, ফোর লেন সিক্স লেন করা হচ্ছে। এতে সমস্যার সমাধান আসবে না। মহাসড়ক থেকে মোড়, হাটবাজার তুলে দিয়ে যান চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে হবে। টোল প্লাজাগুলো ডিজিটাল করতে হবে। 





Source link