শিক্ষায় চরম নৈরাজ্য চলছে: সংসদে বিরোধী দলের এমপিদের ক্ষোভ

48


শিক্ষাতে চরম নৈরাজ্য চলছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় পার্টি, বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্যরা। তাঁদের অভিযোগ, শিক্ষায় দলীয়করণের কারণে শিক্ষকদের ছত্রচ্ছায়ায় ছাত্ররা মাস্তানি করছে। তাঁদের হাতেই শিক্ষকেরা লাঞ্ছিত হচ্ছেন। এতে দেশের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।

আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাবের ছাঁটাইয়ের আলোচনায় অংশ নিয়ে তাঁরা এসব কথা বলেন। 

জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘আজকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কী হচ্ছে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকী বলেছেন—ডাক্তার, প্রকৌশলী বানাচ্ছি কিন্তু মানুষ বানাচ্ছি কতগুলো? দায়িত্ব তো উনিও এড়াতে পারেন না। উনিতো ঢাবির ভিসি ছিলেন। কিন্তু তাঁর কোনো পাবলিকেশন, গবেষণা, ছিল না। ডক্টরেট ডিগ্রি নাই, শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ হয়েছে। সমস্যাটা ওইখানে। যখন যে দল ক্ষমতায় আসবে, সেই দলের শিক্ষকদের পদোন্নতি হবে। তাদের ছত্রচ্ছায়ায় এক শ্রেণির ছাত্রনেতারা মাস্তান হয়ে যায়।’

ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘নড়াইলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ লাঞ্ছিত, জুতার মালা দিয়ে তাঁকে ঘোরানো হয়েছে। সাভারে একজন শিক্ষককে হত্যা করেছে। হত্যাকারী কিশোর গ্যাংয়ের কাছে দাদা বলে পরিচিত। পরিচালনা কমিটি তার আত্মীয়, আরেকজন শিক্ষক তাকে প্ররোচিত করেছে। যে শিক্ষক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। শিক্ষার জায়গাটা নষ্ট হয়ে গেছে। শিক্ষার পরিবেশ দারুণভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।’ 

মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নিজ দলীয় সংসদ সদস্য ফখরুল ইমামের সমালোচনার জবাবে ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘ধর্মীয় শিক্ষা নিয়ে তো কথা বাড়ানোর দরকার নেই। আধুনিক শিক্ষা বানাবেন। হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জি পরিয়ে ছেড়ে দিবেন। এই দেশে এটা তো হবে না। এগুলো বাদ দিয়ে আসল শিক্ষায় আসেন।’ 

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের হাতে সিগারেট দেখেন উল্লেখ করে কাজী ফিরোজ বলেন, ‘হাতে কাপ আর সিগারেট। ছেলে-মেয়ে হাত ধরাধরি করে হাঁটাহাঁটি করছে, আর সিগারেট খাচ্ছে। এটা কোন সংস্কৃতি? কোন শিক্ষা?’ 

শুধু শিক্ষার মান নয়, নৈতিকতাও কমেছে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিকেও শক্ত হতে হবে বলে মনে করেন কাজী ফিরোজ। তিনি বলেন, ‘এখন যাদের হাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গেছে তাদের না আছে শিক্ষা, না আছে দীক্ষা। তারা শুধু বোঝে কীভাবে কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিবে।’ 

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক বলেন, ‘বিবিএসের রিপোর্ট অনুযায়ী প্রতিবছর বাংলাদেশে ১৮-২০ লাখ নতুন চাকরিপ্রত্যাশী জব মার্কেটে প্রবেশ করে। তার মধ্যে দেশে-বিদেশে মিলিয়ে ৫ / ৬ লাখের কর্মসংস্থান হয়। বাকি সবাই থাকে বেকার। এই বেকারের মধ্যে শিক্ষিত বেকার। যে শিক্ষা ব্যবস্থায় বেকারত্ব তৈরি করে। কর্মবিমুখ যে শিক্ষা ব্যবস্থা সেই শিক্ষা ব্যবস্থা আমরা কেন রাখব? কেন আমরা কর্মবিমুখ শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করার চিন্তা করছি না।’ 

মুজিবুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ল’তে অনার্স, মাস্টার্স। আমার এক জুনিয়র সে দেখলাম হঠাৎ করে লিখল, এলএলএম। আমি জিজ্ঞেস করলাম তুমি এলএলএম কোথা থেকে পাইলা? বলে যে প্রাইম ইউনিভার্সিটি থেকে। আমি বললাম, তুমি তো যাও নাই। বলে, স্যার এই অ্যাডমিশনের টাকা দিছি, পরীক্ষা যাই দিছি সার্টিফিকেট পাইয়া গেছি! এই যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্ট কমিশন কোনো মনিটরিং করে বলে আমরা পাই না।’

জাপা মহাসচিব বলেন, ‘এই যে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি করে, এখন পিয়ন পর্যন্ত, পিয়ন, চাপরাশি সবাই বলে বিবিএ, এমবিএ—আরে কী মুশকিলে পড়লাম! বিবিএ, এমবিএ। কী শিক্ষা ব্যবস্থা? এই শিক্ষা ব্যবস্থার তো লাগাম ধরা উচিত। এই যে ধ্বংসের পথে শিক্ষা ব্যবস্থাটা, এটা কন্ট্রোল করা উচিত।’ 

বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ বলেন, ‘আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিক্ষা র‍্যাঙ্কিংয়ে আমরা কোন জায়গায় আছি? কল্পনা করা যায়—৫ হাজারের মধ্যেও নাই! ১৫ বছর একটানা ক্ষমতায়। যেভাবেই থাকেন না কেন, আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিংয়ের জন্য কোনো সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। এখানে গবেষণা ও প্রকাশনা নেই।’ 

বেসরকারি শিক্ষায় করারোপ প্রত্যাহারের দাবি জানান হারুন। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের দুর্নীতির কথা তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মান নিচে নেমে গেছে। সব ক্ষেত্রে অবক্ষয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে আছি। এর কারণ জবাবদিহি ছাড়া কোনো দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। মানসম্পন্ন শিক্ষা তৈরি করতে শিক্ষকদের বেতনভাতা বাড়াতে হবে।’

বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি রুমিন ফারহানা বলেন, ‘শিক্ষার ক্ষেত্রে মানটাই সমস্যা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার জরিপের দেখা যায় শিক্ষার মানে ক্রম অবনমন। র‍্যাঙ্কিংয়ে ধস।’ 

প্রাথমিক শিক্ষা থেকে আরম্ভ করে একদম উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণের বাইরে মন্তব্য করে জাপার সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম বলেন, ‘এইখানে অনেক ঝামেলাপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা এখন প্রচলিত আছে। আমরা দেখি যে শিক্ষা ব্যবস্থাগুলো প্রাইমারিতে আছে সেটা ক্লাস থ্রিতে কী করেছে, ক্লাস টুতে কী করেছে? সবাই মিলে কাজ করি—শিরোনামে মহানবীর সংক্ষিপ্ত জীবনী ছিল সেটা বাদ দিয়েছে। থ্রিতে খলিফা আবু বক্করের সংক্ষিপ্ত জীবনী সেটা বাদ দিয়েছে। ক্লাস ফোরে খলিফা হজরত ওমরের সংক্ষিপ্ত জীবনী সেটা বাদ দিয়েছে। ফিফথে বিদায় হজে শেষ নবীর বাণী ছিল সেটা বাদ দিয়েছে।’ 

পঞ্চম শ্রেণিতে ‘বই’ নামে একটা কবিতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেটা ধর্মীয় গ্রন্থ কোরআন-বিরোধী কবিতা বলে উল্লেখ করে জাপা এমপি বলেন, ‘ষষ্ঠ শ্রেণিতে লাল গরুটি নামক একটি ছোট গল্প আনা হয়েছে। যা মুসলিম শিক্ষার্থীদের শেখানো হচ্ছে গরু হচ্ছে মায়ের মতো। তাই গরু জবাই করা ঠিক নয়। অর্থাৎ হিন্দুত্ববাদ। সপ্তম শ্রেণির বইতে শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লালু নামক একটা গল্প ঢোকানো হয়েছে। যাতে শেখানো হচ্ছে হিন্দুদের কালীপূজা ও পাঁঠাবলির কাহিনি। অষ্টম শ্রেণির বইতে হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ অর্থাৎ রামায়ণের সংক্ষিপ্ত রূপ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এইগুলো কিসের আলামত? আমাদের এখানে আমরা সবাই একসঙ্গে থাকতে চাই।’ 

তিনি বলেন, ‘একটা ধর্মগ্রন্থকে আপনি বাদ দিয়ে আরেকটা ধর্মগ্রন্থকে আপনি প্রাধিকার দিয়ে সেখানে বিশেষ করে ওয়ান, টু, থ্রি, ফোর, সিক্স, সেভেন, নাইন পর্যন্ত আপনি সংস্কৃতি বদলের আপনি চেষ্টা করবেন, সেটা কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অবশ্যই দেখতে হবে।’





Source link