জাজিরায় ফলক উন্মোচন শেষে কাঁঠালবাড়ী জনসভায় প্রধানমন্ত্রী

22


জাজিরা প্রান্তে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী ফলক ও ম্যুরাল-২ উন্মোচন এবং মোনাজাত শেষে কাঁঠালবাড়ীর জনসভায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এর আগে পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তে সুধী সমাবেশে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর প্রধানমন্ত্রী টোল পরিশোধ করে পদ্মা সেতুতে ওঠেন। সেতুতে কিছু সময় দাঁড়িয়ে তিনি জাজিরায় যান।

দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে জনসভা শেষ করে শরীয়তপুরের জাজিরার সার্ভিস এরিয়া-২-এর উদ্দেে সড়কপথে যাত্রা করবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে কিছু সময় অবস্থান করবেন। পরে জাজিরা প্রান্ত থেকে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকার উদ্দেশে রওনা করবেন।

এর আগে আজ সকাল ১০টার দিকে মুন্সিগঞ্জের মাওয়ার অনুষ্ঠানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সফরসঙ্গীরা।

স্বপ্ন দেখা শুরু
১৯৯৮ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই বুনেছিলেন এই স্বপ্নের বীজ। তবে শুরুতে এই যাত্রা ছিল বন্ধুর। বিশ্বব্যাংক ২০১২ সালের ৩০ জুন পদ্মা সেতুর ১২০ কোটি ডলার ঋণসহায়তার চুক্তি বাতিল করে। তাদের দেখাদেখি নিজেদের সরিয়ে নেয় জাইকা, এডিবি ও আইডিবি। ঋণদাতাদের চাপ, দেশে-বিদেশে নানা সমালোচনার মুখে সরিয়ে দেওয়া হয় ওই সময়ের যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানের দিকেও অভিযোগের আঙুল ওঠে। প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলামের নাম কাটা পড়ে। ওই সময়ের সেতুসচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্যসচিব কাজী মোহাম্মদ ফেরদৌসকে যেতে হয় কারাগারে। মাঠে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন। বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিরাও আসেন তদন্তে। এরপর ২০১২ সালের জুলাইতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন নিজের টাকায় পদ্মা সেতু করবে বাংলাদেশ। সারা বিশ্ব অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে—পারবে তো বাংলাদেশ?

২০১৪ সালের ৭ ডিসেম্বর শুরু হলো পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ। পদ্মা সেতু নির্মাণে সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি হয়েছিল এর পাইল ড্রাইভিং নিয়ে। সেতুর কাজ শুরুর পর দেখা গেল, নদীর নিচে মাটির যে স্তর পাওয়া গেছে, তা পিলার গেঁথে রাখার উপযোগী নয়। এ অবস্থায় দুটি বিকল্প রয়েছে। প্রথমত, পাইল নিয়ে যেতে হবে আরও গভীরে। কত গভীরে? ১৩০ মিটার। বাকি থাকে দ্বিতীয় বিকল্প। আর তা হলো—গভীরতা কমিয়ে পাইলের সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়া। গোটা বিশ্বে এই পদ্ধতি প্রয়োগের নজির খুব একটা নেই।

পৃথিবীর অন্য কোথাও কোনো সেতুতে ১২০ থেকে ১২২ মিটার গভীরে পাইল প্রবেশ করাতে হয়নি। এর মধ্যে সর্বোচ্চটি ১৫০ দশমিক ১২ মিটার বা ৪৯২ দশমিক ৫ ফুট। অর্থাৎ, সেতুটি নির্মাণের জন্য এমনকি প্রায় ৫০ তলা ভবনের উচ্চতার সমান দৈর্ঘ্যের পিলার স্থাপন করতে হয়েছে।

আরেকটি রেকর্ড হলো এতে ব্যবহৃত বেয়ারিং। পদ্মা সেতু নির্মাণে পিলার ও স্প্যানের মাঝে প্রতিটি ১০০ টন ওজনের ৯৬টি বিয়ারিং ব্যবহৃত হয়েছে। বিশ্বে এর আগে এত বড় বিয়ারিং আর কোনো সেতুতে ব্যবহার করা হয়নি। এখন রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পেও টিকে থাকবে সেতুটি।

নদীশাসনের কাজেও হয়েছে রেকর্ড। এই সেতু নির্মাণে ১৪ কিলোমিটার এলাকা নদীশাসনের আওতায় আনা হয়েছে। ৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের এই নদীশাসনের কাজটি করেছে চায়না সিনোহাইড্রো করপোরেশন। কোনো সেতু নির্মাণে নদীশাসনের জন্য এখন পর্যন্ত এত বড় চুক্তি আর কোথাও হয়নি।

পদ্মা সেতু নির্মাণে ব্যবহৃত ক্রেনটিও রেকর্ড করেছে। প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, পিলারের ওপর স্প্যান বসাতে যে ক্রেনটি ব্যবহৃত হয়েছে, সেটি আনা হয়েছে চীন থেকে। প্রতি মাসে এর ভাড়া বাবদ গুনতে হয়েছে ৩০ লাখ টাকা। সাড়ে তিন বছরে মোট খরচ হয়েছে ১২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। বিশ্বে এই প্রথম কোনো সেতু নির্মাণে এত দীর্ঘ সময় ক্রেনটি ভাড়ায় থেকেছে। ক্রেনটির বাজারদর ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

মূল সেতুতে ৩০টি উপকরণের ব্যবহার বেশি হয়েছে। পদ্মা সেতুতে সিমেন্ট লেগেছে আড়াই লাখ টনের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশে তৈরি রড ব্যবহৃত হয়েছে ৯২ হাজার টনের বেশি। সেতুতে বালু লেগেছে সাড়ে তিন লাখ টন। বিদ্যুৎ-ব্যবস্থার জন্য সোয়া ৪ কোটি লিটার ডিজেল পোড়ানো হয়েছে। বিটুমিন লেগেছে দুই হাজার টনের বেশি। দেশে তৈরি বিদ্যুতের কেব্‌ল ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় পৌনে তিন লাখ মিটার এবং পাইপ ১ লাখ ২০ হাজার মিটার। পদ্মা সেতুর পাইলিংয়ের ওপরের অংশে মাটিকে বেশি ওজন বহনে সক্ষম করতে একধরনের বিশেষ সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়, যাকে মাইক্রোফাইন বা অতি মিহি সিমেন্ট বলা হয়। সিঙ্গাপুর থেকে আনা ২ হাজার টন এই সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে। কংক্রিটের পথের ওপর প্রথমে দুই মিলিমিটারের পানিনিরোধক একটি স্তর বসানো হয়েছে, যা ওয়াটারপ্রুফ মেমব্রেন নামে পরিচিত। ৫৬০ টন পানিনিরোধক উপকরণ এসেছে যুক্তরাজ্য থেকে। সেতুর পাশে রেলিংয়ের অ্যালুমিনিয়ামও এসেছে যুক্তরাজ্য থেকে।

যেকোনো সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রেই এতে চলাচলকারী যানবাহনের নিরাপত্তা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোথাও ধাতব রেলিং দিয়েই কাজ সারা হয়। আবার কোথাও ব্যবহার করা হয় কংক্রিটের দেয়াল। বাড়তি নিরাপত্তার প্রয়োজন হলে সাধারণত কংক্রিটের দেয়ালকেই বেছে নেওয়া হয়, যাকে প্রকৌশলের ভাষায় প্যারাপেট ওয়াল বলে। পদ্মা সেতুতে এই প্যারাপেট ওয়াল ব্যবহার করা হয়েছে।

৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ সেতুর দুই পাশে এমন দেয়াল রয়েছে মোট ১২ হাজার ৩৯০টি। সঙ্গে অবশ্য স্টিলের রেলিংও বসছে। পদ্মা সেতুর মূল কাঠামোর পাশাপাশি সেতুর ভায়াডাক্টেও এই প্যারাপেট ওয়াল আছে। শুধু সেতুর সড়কপথেই নয়, নিচের রেললাইনের দুই পাশেও একই ধরনের প্যারাপেট ওয়াল বসানো হয়েছে।

শ্রমিক-প্রকৌশলীসহ প্রায় ১২ হাজার কর্মীর মেধা ও শ্রমে তৈরি হয়েছে পদ্মা সেতু। যদি দেশের জনসংখ্যা ১৮ কোটি ধরা হয়, তার অর্ধেকের উপকারে এলেও সাড়ে সাত শ মানুষের স্বপ্নপূরণের জন্য শ্রম দিয়েছেন পদ্মা সেতু প্রকল্পে কাজ করা একেকজন মানুষ।

সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, সেতুর কাজ শুরুর পর এক দিনের জন্যও নির্মাণকাজ বন্ধ রাখা হয়নি। লোকবলের মধ্যে চীনের শ্রমিক-প্রকৌশলী ছিল ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ জন। এর বাইরে সবাই ছিলেন বাংলাদেশের।

পদ্মা সেতু রিখটার স্কেলে প্রায় ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সহ্য করতে পারবে। ধাক্কা সামলানোর শক্তি আছে চার হাজার ডেড ওয়েট টনেজ (ডিডব্লিউটি) ক্ষমতার জাহাজেরও। এমনকি ৬২ মিটার মাটি সরে যাওয়া, আট মাত্রার ভূমিকম্প ও জাহাজের ধাক্কা—এই তিনটি একসঙ্গে ঘটলেও সেতুর কোনো সমস্যা হবে না।





Source link